হেলাল উদ্দীন,বাগমারা : রাজশাহীর বাগমারায় মাছ ব্যবসায়ীকে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা ও পরে ওই হত্যাকারীকে মেরে ফেলার ঘটনায় থানায় পৃথক দুইটি মামলা হয়েছে। একটি মাছ ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাককে হত্যা এবং পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা দুইটি দায়ের হয়। বাগমারা থানার পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। এদিকে দুইজনের লাশের ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক পাঠানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের রনশিবাড়ি বাজারে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেলে আত্রাই উপজেলার গোয়ালবাড়ি গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে টাকা চান একই গ্রামের মাদকসেবি আমিনুল ইসলাম। চায়ের দোকানে চা পান করা অবস্থায় তাঁর কাছ থেকে টাকা চাওয়া হয়। চাহিদা মতো টাকা না পেয়ে বাজারের এক কামারের দোকান থেকে চাকু নিয়ে আবদুর রাজ্জাককে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হয়। এর পরে লোকজন আমিনুল ইসলামকে ধাওয়া করে। তিনও দৌড়ে রনশিবাড়ি গ্রামের আবদুর রশিদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে ক্ষুব্ধ লোকজন বাড়িটি ঘিরে রাখে। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। এসময় পুলিশকে মেরে আমিনুল ইসলামকে ছিনিয়ে নিয়ে স্বীকারোক্তি নিয়ে পিটিয় ও ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দিয়ে মেরে ফেলে। এই ঘটনায় এক উপপরিদর্শক, একজন সহকারী উপপরিদর্শকসহ ছয় পুলিশ আহত হন। এই ঘটনায় গতকাল রাতেই থানায় মামলা হয়। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য আজ শনিবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
আজ শনিবার সকালে সরেজমিনে আত্রাইয়ের গোয়ালবাড়ি ও বাগমারার রনশিবাড়ি এলাকায় গিয়ে গতকালের ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও নিহতদের বিষয়ে জানা গেছে নানা তথ্য। আমিনুল ইসলামকে এলাকার লোকজন নেশাখোর হিসেবে জানে। নেশার জন্য লোকজনের কাছ থেকে টাকা দাবি করতো। টাকা না দিলো গালাগাল ও হুমকি দিতো বলে স্থানীয় অর্ধশত লোকজন জানিয়েছেন। নিহত আবদুর রাজ্জাকের মা আনোয়ারা বেগম (৬২) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলের কাছ থেকে মাছ বিক্রির টাকা চেয়েছিল আমিনুল। দেড়শ টাকা দিয়েছে। আরও টাকার জন্য চাকু দিয়ে মেরে ফেলেছে। স্ত্রী শারমিন সুলতানা (৩০) কথাই বলতে পারেননি। তিনি কেঁদেই যাচ্ছেন। কখনো মূর্চ্ছনায় যাচ্ছেন। ছয় বছরের একমাত্র মেয়ে মাইশা খাতুন বাড়িতে লোকজনদের ভীড় ও কান্নাকাটি দেখে জানতে পেরেছে তার বাবা মারা গেছে। তবে মৃত্যু কী তা বুঝতে পারেনি। মা ও দাদির কান্নাকাটি দেখে মাঝেমধ্যে কাঁদলেও পরে থেমে যাচ্ছে সে।
আমিনুলের বাড়িতেও নিস্তব্ধতা দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা জানান, সে ভালো ছিল না। তবে এভাবে মেরে ফেলা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন। ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার ছিল রনশিবাড়ি হাটবার। আত্রাইয়ের গোয়ালবাড়ি ও বাগমারার রনশিবাড়ি পাশাপাশি গ্রাম। গোয়ালবাড়ি গ্রামের লোকজনের চলাফেরা এই রনশিবাড়ি গ্রামে। রনশিবড়ি গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রশিদ জানান, তাঁর বাড়িতে আমিনুল আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাত আটটা পর্যন্ত রক্ষা করতে পারলেও পরে সম্ভব হয়নি।
তাঁরা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার পর পুলিশকে মারপিট করে আমিনুলকে ছিনিয়ে নিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলে শত শত লোকজন। ছিনিয়ে নেওয়ার পর অনেকে ভিডিও করে স্বীকারোক্তি নেয়। এসময় পানি পান করতে চেয়েছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সোবহান ( ৬০) জানান। তবে ভয়ে কেউ পানি দেয়নি। পরে চোখের সামনে মেরে ফেলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মব তৈরি করে মেরে ফেলার সঙ্গে গোয়ালবাড়ির লোকজন জড়িত। রনশিবাড়ির লোকজন রক্ষা করার চেষ্টা করেও পারেনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ জনতা আমিনুল ইসলামকে ধরে এনে কেন মাছ ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাককে কেন মেরেছে। জবাবে জানান,তাঁকে আজ জুআর নামাজ পড়তে দেননি রাজ্জাক। কয়েক কিলোমিটার দূরে বান্দাইখাড়ায় নামাজ আদায় করেছেন। তবে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এসময় লোকজনকে তাঁকে শাসাতে দেখা যায়। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে মেরে ফেলার জন্য অনুতপ্ত হতে দেখা যায় আমিনুল ইসলামকে। আরেক ভিডিওতে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলানোর পর মগজ বের হতে দেখা যায়। কয়েকজনকে কাছে এসে থেঁতলানো মাথা দেখিয়ে বলতে শোনা যায়, এখন মরে গেছে। এর পরে সটকে পড়েন বিক্ষুব্ধ লোকজন।
বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশকে মারপিট করে আমিনুল ইসলামকে হত্যার দায়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি এবং রাজ্জাককে হত্যার দায়ে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। ক্ষুব্ধ লোকজনের হামলায় এক উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শকসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :