
॥ রুস্তম আলী মন্ডল ॥
অনলাইন ডেস্ক : দিনাজপুর, ১ জুন, ২০২৬ : দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী বেদানা লিচুসহ সব ধরনের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। মহোৎসবে চলছে লিচু বেচা-কেনা। শহরের লিচুর বাজার জমে উঠেছে।
দিনাজপুর ফল নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত হর্টিকালচার বিভাগের অভিমত, এবারে লিচু বিক্রির খাত থেকে লিচু চাষিরা ৮শ’ থেকে ৯শ’ কোটি টাকা আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিন গতকাল রোববার বিকেলে জেলার কালিতলা লিচুর পাইকারি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে,মধু মাসে লিচুর বাজার ক্রেতা বিক্রেতাদের ভীড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন এখান থেকে বিভিন্ন যানবাহনে সুস্বাদু লিচু বেদানাসহ অন্যান্য লিচুগুলো পাইকাররা বিভিন্ন জেলায় চাহিদা অনুযায়ী ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছে।
একই অবস্থা লক্ষ্য করে গেছে শহরে অস্থায়ী লিচুর পাইকারি বাজার পুলহাট এলাকায়। এখানে বসেছে লিচু ও আমের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার। এখানে লিচু ও আমের বাগান মালিকরা তাদের উৎপাদিত লিচু পাইকারি বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে আসছেন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা লিচু ক্রয়ের জন্য এই বৃহৎ পাইকারি বাজারে আসছেন। পাইকাররা আড়তদারদের সাথে দরদাম করে তাদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী দিনাজপুর ঐতিহ্যবাহী বেদানা লিচুসহ মাদ্রাজি, কাঁঠালি, বোম্বাই ও চায়না থ্রিসহ উন্নত জাতের লিচু স্বাচ্ছন্দ্যে ক্রয় করে বিভিন্ন পরিবহন যোগে তাদের গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাচ্ছেন। লিচুর পাইকারি বাজারে মধু মাস হিসেবে পরিচিত জ্যৈষ্ঠ মাসে লিচু ক্রয় বিক্রয়ের ক্রেতা বিক্রেতাদের মহোৎসব চলছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই পাইকারি বাজারে ব্যাপকহারে লিচু ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে।
আবার খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে আগত ক্রেতাদের নিকট একইভাবে লিচু বিক্রি করছেন। লিচুর বাজারগুলোতে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন হাক-ডাকসহ গরম করে ক্রেতাদের নিকট লিচু বিক্রি করছেন। অনেক ক্রেতায় লিচু ক্রয়ের পূর্বে লিচুর অবস্থান ও স্বাদ যাচাইয়ের জন্য লিচু খেয়ে দেখে ক্রয় করেছেন।
এদিকে জেলার বিভিন্ন অফিস আদালতের কর্মকর্তারা এই জেলায় চাকরি করার কারণে তাদের উচ্চ মহলের কর্তা ব্যক্তিদের এই মধু মাসে লিচু উপহার দেয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে হয়। এজন্য এসব অফিস আদালত থেকে আগাম লিচু ক্রয় করার জন্য সদর উপজেলার উলিপুর,আউলিয়াপুর, মাছিমপুর, সিকদারহাট, পুলহাট, মহব্বতপুর, এবং বিরল উপজেলার ফারাক্কাবাঁধ, মঙ্গলপুর, মাধববাটি, বোডেহাট, ধুকুরঝারিসহ একাধিক এলাকায় অবস্থিত উন্নত মানের লিচু ক্রয়ে তারা বাগানে গিয়ে লিচুর মান যাচাই করেছেন। পছন্দ হলে চাহিদা অনুযায়ী লিচু ক্রয় করছেন। তাদের লিচু নিজস্ব পরিবহনে যত্ন সহকারে অফিসের নিজস্ব লোক মারফত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার দপ্তর প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করা হচ্ছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার সিকদার গ্রামের লিচু বাগান মালিক মো. সাকের আলী বলেন,ভাল ও উন্নত মানের লিচু প্রতি বছর বাগান থেকেই বিভিন্ন সরকারের দপ্তরের কর্মকর্তারা এভাবে ক্রয় করে নিয়ে যায়। এবারও একইভাবে বাগান থেকে উন্নতমানের লিচু বিক্রয়ের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। বাগান মালিকরা তাদের বাগান থেকে যত্ন সহকারে লিচু পেড়ে এসব ভিআইপি ক্রেতাদের নিকট যানবাহনে পরিবহনের জন্য স্বচ্ছভাবে বাঁশের ঝুড়িতে লিচুর পাতা বিছিয়ে যত্ন সহকারে প্যাকেটিং করে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। প্রতিদিন লিচুর বাগানগুলো থেকে কয়েকশ’ যানবাহনে এভাবেই লিচু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও চায়না-৩ জাতের লিচু থাকলেও মোম্বাই, হারিয়া, চায়না-২, মোজাফরি, কাঁঠালি জাতের লিচু বাজারে আসতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। আবহাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে লিচু চাষিরা একটু আগে-ভাগেই বাগান থেকে লিচু পাড়তে শুরু করেছেন।
গতকাল শহরের ফলের বাজার কালিতলা নিউ মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভীড়। জাত এবং আকার-ভেদে বিভিন্ন দামে লিচু বিক্রি হচ্ছে। যেমন প্রতি একশ’ লিচু মাদ্রাজি বিক্রি হচ্ছে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকা, বেদানা লিচু বিক্রি হচ্ছে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা,,এবং চায়না-৩ বিক্রি হচ্ছে ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকা। দিনাজপুরে উৎপাদিত লিচু শতকরা ২০ ভাগ অত্র জেলার চাহিদা মিটিয়ে শতকরা ৮০ ভাগ লিচুই চলে যাচ্ছে সারা দেশের অন্যান্য জেলায়।
দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বাসস’কে জানান, দিনাজপুরের সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী বেদানা লিচু জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গত দু’বছর থেকে এই সুস্বাদু বেদানা লিচু বিদেশে রপ্তানি করে কৃষি অর্থনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু বিদেশি এই সুস্বাদু বেদানা লিচু ক্রয় করার জন্য কৃষি বিভাগের সাথে যোগাযোগ করেছেন। গত বছর দিনাজপুরের সুস্বাদু বেদানা লিচু ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় যত্ন সহকারে সফলভাবে পাঠানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাসস’কে বলেন, জেলায় লিচুর মৌসুম শুরু থেকেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লিচু ও অন্যান্য ফল নিয়ে কাজে নিয়োজিত মাঠকর্মীরা বাগান মালিকদের লিচুর ভাল ফলন উৎপাদন করতে সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছেন। এবারে চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টি প্রবাহ ছিল। জৈষ্ঠ্য মাসেও কিছুটা বৃষ্টি হয়েছে। ফলে লিচুর বাগান ও গাছে থাকা লিচু যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য লিচু চাষীদের সঠিক পরামর্শ দিয়ে গাছে থাকা লিচু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। সেই সাথে লিচু বিক্রি ও বাজারজাত করার চাষিরা তাদের লিচু ভালো দামে বিক্রি করতে সক্ষম হচ্ছেন।
তিনি বলেন, চলতি বছর সুস্বাদু বেদানা লিচু, বেশ কয়েকটি দেশ নেওয়ার জন্য আগাম আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের আগ্রহ অনুযায়ী লিচু পাঠানোর জন্য প্রস্তুতির কাজ চলছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
জেলা শহরে কালিতলা নিউ মার্কেটের লিচুর আড়তদার ও ব্যবসায়ী মওলা বক্স বাসস’কে বলেন, কিছুদিন পূর্বে প্রচণ্ড রোদ আর গরমের কারণে মাদ্রাজি লিচু ঝরে পড়ায় এই লিচুর সরবরাহ একেবারেই কম। সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর ফলে ক্রেতাদের একটু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার লিচুর আমদানি ভাল রয়েছে।
লিচুর খুচরা ব্যবসায়ী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে আগত পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারণে লিচুর বাজার চড়া। আমরা স্থানীয় বাজার ও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী বেদানা লিচু প্রতি একশ’ ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় নিচ্ছি। সেখানে ঢাকার পাইকাররা নিচ্ছে ৬শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা দরে। এরফলে লিচু চাষিরা ঢাকার পাইকারদের সাথে জমিয়ে ব্যবসা করছে। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে ক্রেতাদের ওপর। গত বছরে তুলনায় এবারে একটু বেশি দামে লিচু কিনতে হচ্ছে।
জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে লিচু কিনতে আসা ক্রেতা মনিরুজামান মিয়া বলেন, গতবারের তুলনায় লিচুর দাম একটু বেশি। তবে দাম যাই হোক বছরের ফল খেতে তো হবে। তাই দু’শ লিচু পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছি।
শহরের কালিতলা নিউমার্কেটে পাইকারি বাজারে ইজারাদার মো. দবিরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, এটা দিনাজপুর শহরে সবচেয়ে বড় ফলের বাজার। এখানে দৈনিক ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সম্ভাবনাময় ফলের এই বাজারটি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ইজারাদারসহ লিচু বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিমত ব্যক্ত করেন।
দিনাজপুর হটিকালচার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. এজামুল হক বলেন, চলতি বছর দিনাজপুরে ৭ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। লিচু বাগান গুলোতে গাছ রয়েছে, প্রায় ১১ হাজার ৫৮০টি। এবার উৎপাদনের
লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন লিচু। যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিতে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, চলতি বছর বিগত বছর গুলোর তুলনায় লিচুর বাজার দর একটু বেশি থাকায় এবারে প্রায় ৮শ’ থেকে ৯শ’ কোটি টাকার অধিক লিচু বিক্রি খাত থেকে লিচু চাষিরা সম্ভাব্য আয় করতে পারবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করছেন।
সুত্র: বাসস
আপনার মতামত লিখুন :